নারী সদস্যদের রোকনিয়াত বাতিল: জামায়াতের 'পশ্চাৎপদ' সিদ্ধান্ত নিয়ে বাড়ছে সমালোচনা
নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সম্প্রতি তাদের নারী সদস্যদের সাংগঠনিক পদমর্যাদা বা 'রোকনিয়াত' নিয়ে এক বিতর্কিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে, যা দলের ভেতরে ও বাইরে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। দেশের বিভিন্ন মহিলা মাদ্রাসা, মহিলা কলেজ এবং গার্লস স্কুলে কর্মরত নারী রোকনদের সদস্যপদ বাতিল করার এই প্রক্রিয়া শুরু করেছে দলটি।
সিদ্ধান্তের নেপথ্যে যুক্তি ও বাস্তবতা দলীয় সূত্রমতে, নারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকাকালীন পর্দার বিধান লঙ্ঘন বা কোনো অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় জামায়াত এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যাতে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার দায়ভার সংগঠনের ওপর না আসে, সেজন্যই তাদের রোকনিয়াত বাতিল করা হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে। তবে এই সিদ্ধান্তের সত্যতা যাচাই করতে দেশের বিভিন্ন জেলা পর্যায়ের দায়িত্বশীলদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা নিশ্চিত করেছেন যে, কেন্দ্র থেকেই এমন নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে।
বিরাট এক সেক্টরকে হাতছাড়া করার ঝুঁকি বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জামায়াতের এই সিদ্ধান্ত দলটির জন্য 'বুমেরাং' হতে পারে। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৪,৭৮২টি নারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (মাদ্রাসা, স্কুল ও কলেজ) রয়েছে, যেখানে প্রায় ২৭ থেকে ৩০ লক্ষ ছাত্রী পড়াশোনা করে। জামায়াতের রোকনরা এসব প্রতিষ্ঠান থেকে সরে দাঁড়ালে বা সাংগঠনিকভাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়লে এই বিশাল নারী গোষ্ঠীর কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানোর পথ রুদ্ধ হয়ে যাবে। অতীতে শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতি অঙ্গন থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেওয়ার ফলে যেভাবে সেখানে বামপন্থি আদর্শের বিস্তার ঘটেছে, এই সিদ্ধান্তের ফলেও নারী শিক্ষা অঙ্গনে একই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে ।
যৌক্তিক অসারতা ও বৈষম্যের অভিযোগ জামায়াতের এই সিদ্ধান্তের কঠোর সমালোচনা করে বলা হচ্ছে, এটি এক ধরণের ‘মাথা ব্যথায় মাথা কেটে ফেলা’র মতো সিদ্ধান্ত। পর্দার অজুহাত দেওয়া হলেও প্রশ্ন উঠেছে, যারা পুরুষ শাসিত বা সাধারণ প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন, তাদের ব্যাপারে কেন একই নিয়ম প্রযোজ্য হচ্ছে না? । এছাড়া, বিচ্ছিন্ন কোনো অনৈতিক ঘটনার দোহাই দিয়ে পুরো একটি পেশাজীবী শ্রেণিকে সাংগঠনিকভাবে দূরে ঠেলে দেওয়াকে অনেকেই বিচক্ষণতার অভাব বলে মনে করছেন ।
রাজনৈতিক প্রভাব ও ভাবমূর্তি সঙ্কট বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যখন বিরোধী পক্ষ জামায়াতকে ‘নারীবিদ্বেষী’ হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করছে, ঠিক তখন এমন সিদ্ধান্ত তাদের হাতে নতুন অস্ত্র তুলে দেওয়ার শামিল। বর্তমান আমির ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে যখন দলটি নিজেদের আধুনিক ও উদারপন্থি রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছে, তখন এমন একটি পশ্চাৎপদ সিদ্ধান্ত কর্মীদের মাঝেও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে ।
এমনকি কওমি অঙ্গনের মতো রক্ষণশীল গোষ্ঠীগুলোও যখন নারী শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে এগিয়ে আসছে, তখন জামায়াতের মতো একটি গণতান্ত্রিক ও মডার্ন ইসলামিক দলের এমন সিদ্ধান্তকে অনেকেই বিষ্ময়কর বলে অভিহিত করেছেন । রোকনিয়াত বাতিলের এই সিদ্ধান্ত দলটির নারী সদস্য ও সাধারণ সমর্থকদের মধ্যে কী ধরনের প্রভাব ফেলে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
দলের নীতিনির্ধারণী মহল এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করবে কি না, তা নিয়ে সাধারণ কর্মীদের মাঝে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনা চলছে ।
Tags
রাজনৈতিক
